বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে বাংলাদেশের আইনে যা আছে
বাংলাদেশে বিয়ে শুধু দুটি মানুষের একসঙ্গে পথ চলার চুক্তি নয় এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে পরিবার, ধর্মীয় বিধান, সামাজিক রীতি এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ। তবে বাস্তব জীবনে অনেক সময় দাম্পত্য সম্পর্ক এর বিচ্ছেদ প্রয়োজনীয় হয়ে পরে । বিচ্ছেদের প্রশ্ন যখন আসে, তখন অনেকেই আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে না। এই আর্টিকেলে বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে বিবাহবিচ্ছেদের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হলো।
মুসলিম আইনে বিবাহবিচ্ছেদ
বাংলাদেশে মুসলিম বিবাহ ও তালাক মূলত দুটি আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ ১৯৬১ এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন ১৯৭৪। এই আইনের আওতায় স্বামী এবং স্ত্রী-উভয়েরই তালাক দেওয়ার অধিকার রয়েছে, তবে প্রক্রিয়াটি উভয়ের জন্য ভিন্ন।
সাধারণ প্রক্রিয়া: যে-ই তালাক দিক না কেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৭ ধারা অনুযায়ী তা অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বা সিটি করপোরেশনের মেয়র বরাবর আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠাতে হবে। নোটিশ পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা করেন। সমঝোতা না হলে নোটিশ পাওয়ার ৯০ দিন পর তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়।
পুরুষের তালাকের অধিকার ও সীমাবদ্ধতা
ইসলামি বিধান অনুযায়ী মুসলিম পুরুষ স্ত্রীকে তালাক দিতে পারেন। তবে এটি কেবল মৌখিকভাবে করলে আইনত বৈধ হয় না। উপরে উল্লিখিত লিখিত নোটিশ প্রদান ও ৯০ দিনের অপেক্ষার বিধান মানতে হবে।
তবে স্বামী যদি আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন, তাহলে তিনি আইনত শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেন। মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৬ ধারা অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড অথবা দশ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে। পাশাপাশি স্ত্রীর দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করার বাধ্যবাধকতাও আরোপিত হয়।
নারীর বিবাহবিচ্ছেদের অধিকার
মুসলিম নারীর জন্য বাংলাদেশ আইনে বিচ্ছেদের তিনটি পথ উন্মুক্ত রয়েছে।
তালাক-তাফওয়িজ: বিয়ের সময় নিকাহনামায় যদি স্বামী স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার অধিকার অর্পণ করেন, তাহলে স্ত্রী নিজেই সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটাতে পারেন। এটি নারীর জন্য সবচেয়ে সহজ ও সরাসরি পথ, তবে এই অধিকার নিকাহনামায় উল্লেখ থাকা আবশ্যক।
খোলা তালাক: স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে এই ধরনের বিচ্ছেদ হয়। সাধারণত স্ত্রী দেনমোহরের একটি অংশ বা পুরোটা ফিরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে এই বিচ্ছেদ সম্পন্ন হয়।
আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ: ডিজোলিউশন অব মুসলিম ম্যারিজ অ্যাক্ট ১৯৩৯ অনুযায়ী একজন মুসলিম নারী কিছু নির্দিষ্ট কারণে আদালতের কাছে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন। এসব কারণের মধ্যে রয়েছে স্বামীর দীর্ঘকালীন অনুপস্থিতি বা নিখোঁজ থাকা, ভরণ-পোষণ না দেওয়া, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, দাম্পত্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা ইত্যাদি।
অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর তালাক ও ইদ্দত
ইসলামি শরীয়ত অনুযায়ী স্বামী চাইলে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকেও তালাক দিতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রে তালাক কার্যকর হওয়ার আগে স্ত্রীর ইদ্দত সম্পন্ন হতে হবে। স্ত্রী যদি গর্ভবতী থাকেন, তাহলে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরই ইদ্দতকাল শেষ বলে গণ্য হয় এবং সেই মুহূর্তেই তালাক চূড়ান্তভাবে কার্যকর হয়।
ইদ্দতকালীন সময়ে স্ত্রী বেশ কিছু আইনি অধিকার ভোগ করেন। এই সময়ে স্বামী ভরণ-পোষণ দিতে বাধ্য। স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা হলে সন্তান জন্মদান পর্যন্ত এই দায়িত্ব বজায় থাকে। এ ছাড়া স্ত্রী তার সম্পূর্ণ দেনমোহর এবং প্রাপ্য সম্পদ দাবি করার অধিকার রাখেন।
হিন্দু আইনে বিবাহবিচ্ছেদের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা। শাস্ত্রীয় হিন্দু আইনে বিবাহ একটি অটুট ধর্মীয় বন্ধন হিসেবে বিবেচিত, তাই বিবাহবিচ্ছেদের কোনো বিধান নেই। বাংলাদেশে প্রণীত হিন্দু বিবাহ আইন ২০১২-তেও ডিভোর্সের সুযোগ রাখা হয়নি।
তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে হিন্দু বিবাহিত নারীর সুরক্ষার জন্য দ্য হিন্দু ম্যারিড ওম্যান’স রাইট টু সেপারেট রেসিডেন্স অ্যান্ড মেইন্টেন্যান্স অ্যাক্ট ১৯৪৬ প্রযোজ্য। এই আইনের আওতায় স্বামীর নির্যাতন, অবহেলা বা দায়িত্বহীনতার মতো ক্ষেত্রে একজন হিন্দু নারী আলাদা বসবাসের এবং ভরণ-পোষণ পাওয়ার অধিকার দাবি করতে পারেন।
পুনর্বিবাহের বিষয়ে বলতে গেলে, স্বামীর মৃত্যু হলে হিন্দু নারী আইনত পুনরায় বিয়ে করতে পারেন। তবে ডিভোর্সের কোনো আইনগত পথ না থাকলেও বাস্তবে অনেক হিন্দু নারী আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদের ঘোষণা আদায় করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন । যদিও এটি সম্পূর্ণ আইনসিদ্ধ পথ নয় এবং বিষয়টি আইনি জটিলতামুক্ত নয়।
বাংলাদেশে বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত আইন ধর্মভেদে আলাদা এবং ক্ষেত্রবিশেষে জটিল। সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং নিজের অধিকার সুরক্ষিত রাখতে একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া সবসময়ই বুদ্ধিমানের কাজ।